১৪ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ইং,শুক্রবার,সকাল ৯:৩২

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০
একুশে পদক প্রাপ্ত ‘সব্যসাচী লেখক’ সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন

।। সাংবাদিক আইয়ুব ভুঁইয়া ।।

ছবিঃ প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের সাথে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিক আইয়ুব ভুঁইয়া । 

সৈয়দ শামসুল হকের প্রয়ান দিবস আজ । ২০১৬ সালের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদ তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। তার লেখক জীবন প্রায় ৬২ বছরব্যাপী বিস্তৃত। সৈয়দ হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ২০০০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
বাবা মারা যাওয়ার পর অর্থকষ্টে পড়লে চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন সৈয়দ হক। ১৯৫৯ সালে তিনি ‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেন। পরে তোমার আমার, শীত বিকেল, কাঁচ কাটা হীরে, ক খ গ ঘ ঙ, বড় ভাল লোক ছিল এবং পুরস্কারসহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেন। বড় ভাল লোক ছিল ও পুরস্কার চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে তিনি লন্ডন চলে যান এবং সেখানে বিবিসির বাংলা খবর পাঠক হিসেবে যোগ দেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসর্মপণের খবর তিনিই পাঠ করেছিলেন। পরে ১৯৭২ থেকে ৭৮ সাল পর্যন্ত বিবিসি বাংলার প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দৃঢ়কণ্ঠ ও সাবলীল উচ্চারণের জন্য এসময় তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
সৈয়দ হকের কবিতায় রয়েছে গভীর অনুপ্রেরণা। তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ একদা এক রাজ্যে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। পরে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা, পরাণের গহীন ভেতর, নাভিমূলে ভস্মাধার, আমার শহর ঢাকা, বেজান শহরের জন্য কেরাম, বৃষ্টি ও জলের কবিতা কাব‌্যগ্রন্থগুলো তাকে পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয় করে । সৈয়দ হক মৃত্যুর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে তার শেষ কবিতা লিখেন। কবিতার নাম ‘আহা, আজ কি আনন্দ অপার!’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ১৯৫৬ সালে সৈয়দ হকের প্রথম উপন্যাস দেয়ালের দেশ প্রকাশিত হয়। তার রচিত এক মহিলার ছবি (১৯৬১), অনুপম দিন (১৯৬২), সীমানা ছাড়িয়ে (১৯৬৪) উপন্যাসগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। ষাটের দশকে তার রচিত উপন্যাসগুলো পূর্বাণী পত্রিকায় ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হত। তার `খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় উঠে। অনেকে এটিকে যৌন আশ্রিত বলে সমালোচনা করেন। তিনি ভূমিকায় এই উপন্যাসকে ‘এদেশের সবচেয়ে ভুল বোঝা উপন্যাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সৈয়দ হক নাট্যকার হিসেবেও সফলতা পেয়েছেন। বিবিসি বাংলায় নাটকে কাজ করার মাধ্যমে তিনি নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি পান। তার ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত একটি কাব্য নাটক। তার পরের নাটক ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’ ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত। সৈয়দ হক তার রচনায় সমসাময়িক বাংলাদেশ এবং মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ-অনুভূতি ও ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরেন। তার অন্যান্য নাটক নারীগণ, যুদ্ধ এবং যোদ্ধা, ঈর্ষা, এখানে এখন-এ সমকালীন বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে।
২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিলে তাকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়। লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে পরীক্ষায় তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেন। চার মাস চিকিৎসার পর ২ সেপ্টেম্বর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৮ সেপ্টেম্বর তার মরদেহ কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পাশে দাফন করা হয় ।
সাংবাদিকতার শুরুতেই এই সব্যসাচী লেখকের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয় আমার । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার সাথে ঘুরেছি । সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে তার ধারাবাহিক লেখা ‘হৃত কলমের টানে’ পড়তে প্রতি সপ্তাহে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম । তার লেখা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক বেশ কয়েকবার দেখেছি । সাড়া জাগানো নাটক ‘ নুরুলদিনের সারাজীবন ‘ কয়েকজন বিদেশি নাট্যকারসহ গাইড হাউজে তার সাথ বসে দেখেছি ।
সৈয়দ হক ছিলেন প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম ঢৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু । কাইয়ুম ভাই আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন । পরিচয়ের শুরু থেকে জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও হক ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো এবং তার সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার ছিল অবাধ বিচরণ । তাঁর সারা জীবনের কাজ আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ । তিনি লিখে গেছেন এ জনপদের মানুষের জীবন যুদ্ধের কথা। তার লেখনীতে উঠে এসেছে আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। লন্ডনের হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায়ও লিখে গেছেন কবিতা । গেয়েছেন জীবনের জয়গান। স্বপ্ন দেখেছেন মানুষের মুক্তির । মৃত্যুবার্ষিকিীতে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি ।

0Shares
আরো খবর »

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ওয়াহিদুজ্জামান
ফোনঃ +৮৮-০১৭৪২৩৪১৫২৩
ইমেইলঃ wzaman288@gmail.com

স্মরনিকা
২৪৭, টুটপাড়া মেইন রোড,
খুলনা-৯১০০, বাংলাদেশ ।
মোবাইলঃ+ ৮৮-০১৯২২৫৫৭৮৯৬
ইমেইলঃ dkhulnanews@gmail.com

কপিরাইট © ২০১৭ |
সর্বস্বত্ব ® স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ডিজিটালখুলনা.কম |
উন্নয়নে Real IT Solution