১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ,২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং,সোমবার,রাত ১২:০৮

মে ১৩, ২০২১
ফিরে দ্যাখাঃ বেপরোয়া পর্যটক দ্বারা পদদলিত সাগরকন্যা জিঞ্জিরা বা সেন্ট মার্টিন

।। সাংবাদিক আইয়ুব ভূঁইয়া ।।

ছবিঃ ১৯৮৪ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে যাত্রাকালে সাংবাদিক আইয়ুব ভুঁইয়ার সামনে বসে আছেন লেফটেনেন্ট সামাদ এবং সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুশতাক ।

 

১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির সকাল ৭টা। নাফ নদীর মোহনা ধরে আমাদের যন্ত্রচালিত নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের দিকে । সেখানে তিন দিন আমাদের এডভেঞ্চার ট্রেনিং এবং প্রতিকী নৌমহড়া অনুষ্ঠিত হবে । আমার সামনে বসে আছেন লেফটেনেন্ট সামাদ এবং সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুশতাক । দ্বিতীয় ছবিতে প্রতিকী মহড়া চলাকালীন বায়নুকুলারে আমি সাগরে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি । তৃতীয় ছবিতে সেন্ট মার্টিনে আমাদের তাঁবুর সামনে আমি ও এডজুটেন্ট সালাম । চতুর্থ ছবিতে ট্রেনিং শেষে ১৭ ফেব্রুয়ারি টেকনাফের শাহ পরিদ্বীপে ফিরে আসার পর আমাদের মহড়া নিয়ে কথা বলছেন মেজর লিয়াকত ও ক্যাপ্টেন এম আর চৌধুরী। মাঝে আমি । তিন দিনের এই ট্রেনিং ও মহড়ায় ময়নামতি রেজিমেন্টের ৫২ জন ক্যাডেট অংশ নেন। বৃহত্তর কুমিল্লা, সিলেট ও নোয়াখালী নিয়ে ময়নামতি রেজিমেন্ট গঠিত। এতে কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লেফটেনেন্ট সামাদ । সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মুশতাক । আমি ছিলাম রেজিমেন্টাল সার্জেন্ট মেজর (আর এস এম )। আর টেকনাফের শাহ পরিদ্বীপে বসে ট্রেনিং ও মহড়া মনিটর করেন মেজর লিয়াকত ও ক্যাপ্টেন এম আর চৌধুরী । এডভেন্সার ট্রেনিং ও মহড়ার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের সময়ে প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে জীবন যাপন করতে হয় সে অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

বয়সের কারণে সেদিন সেন্ট মার্টিন পৌঁছে আমাদের অনেকে ইমোশনাল হয়ে যায়। কেউ কেউ নিজেকে ‘ভাস্কো দ্য গামা’ ভাবতে শুরু করে। দ্বীপটি তখন এত পরিচিত ছিলনা । স্থানীয়দের কাছে এই দ্বীপ ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে পরিচিত । তারা সেন্ট মার্টিন বুঝতনা। তখন সেখানে শুধু কিছু টিনের ঘর ছিল । স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য । ইট, বালু, সিমেন্ট এবং রড তখনও সেন্ট মার্টিনকে স্পর্শ করতে পারেনি । জেগে উঠেনি ছেড়া দ্বীপের অস্তিত্ব । আমরা ফিরে আসার বছর খানেক পর হুমায়ুন আহমেদ সেন্ট মার্টিন যান এবং গড়ে তোলেন প্রথম পাকা স্থাপনা। শুরু হয় সেন্ট মার্টিনের বুকে ইট, বালি, পাথর, সিমেন্ট আর রডের তান্ডব। আজও সে তান্ডব চলছে ।
কোটি কোটি বেপরোয়া পর্যটক পদদলিত করেছে সাগর কন্যা নারিকেল জিঞ্জিরাকে। মানুষের বানিজ্যিক লালসায় সে আজ ক্ষত বিক্ষত, বিবর্ণ । বিভিন্ন উপলক্ষে এপর্যন্ত আমি ১১বার এই দ্বীপে গিয়েছি । কিন্তু প্রতিবারই গভীর হতাশা নিয়ে ফিরে এসেছি । কারণ ৩৬ বছর আগে ভার্জিন নারিকেল জিঞ্জিরা বা সেন্ট মার্টিনে আমি যে নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখেছি তার কিছুই নেই। সেখানে এখন বুনো ফুলের গন্ধ নেই। আনাড়ী পর্যটকের কোলাহলে হারিয়ে গেছে পাখির কলতান। জীবন্ত প্রবালের অস্তিত্ব নেই, নামেই শুধু প্রবাল দ্বীপ। এক সংগে হাজারো মানুষের সরব পদচারনার কাছে হার মেনেছে সমুদ্রের গর্জন। বঙ্গোপসাগরের সেই নীল জলরাশির স্বচ্ছ তলদেশে এখন আর দেখা যায়না বিচিত্র মাছ ও শৈবাল। ‘জিঞ্জিরা’ নাম হারিয়ে সে এখন সেন্ট মার্টিনে পরিনত হয়েছে। দ্বীপের ‘জিঞ্জিরা প্রাথমিক বিদ্যালয়’ তার আদি নামটি এখনও ধরে রেখেছে। প্রায় চার দশক আগে আমার দেখা সেই নারিকেল জিঞ্জিরা এখন কেবলই স্মৃতি।

0Shares

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ওয়াহিদুজ্জামান
ফোনঃ +৮৮-০১৭৪২৩৪১৫২৩
ইমেইলঃ wzaman288@gmail.com

স্মরনিকা
২৪৭, টুটপাড়া মেইন রোড,
খুলনা-৯১০০, বাংলাদেশ ।
মোবাইলঃ+ ৮৮-০১৯২২৫৫৭৮৯৬
ইমেইলঃ dkhulnanews@gmail.com

কপিরাইট © ২০১৭ |
সর্বস্বত্ব ® স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ডিজিটালখুলনা.কম |
উন্নয়নে Real IT Solution