১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ,২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং,সোমবার,রাত ১২:৩৬

এপ্রিল ১৬, ২০২১
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের রচয়িতা অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয়

।। সাংবাদিক আইয়ুব ভুঁইয়া ।।

বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ‍সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের রচয়িতা অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। একটি উপন্যাসই বাংলা সাহিত্যে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। কিন্ত তার জীবনের মেয়াদ খুব বেশি দিন ছিলনা। মাত্র ৩৭ বছর বেঁচেছিলেন। এই জীবনটাও আবার অভাব-অনটনে ক্ষত বিক্ষত এবং দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল। এই স্বল্প মেয়াদের জীবনেই বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। কালজয়ী এই উপন্যাসে তিতাস তীরবর্তী মানুষের কঠিন জীবন সংগ্রামকে গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন তিনি। প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমশ মুছে-আসা মৎস্যজীবী যে মানুষদের কাহিনী এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তিনি সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির কারণেই উপন্যাসটিতে ধীবর সমাজের কঠিন জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনী হয়ে উঠেছে অবিনশ্বর ও অসাধারণ।
উপন্যাসটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তাঁরারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্ত পারে না।”
তিতাস নদী ও তার দু’কূলের মানুষের জীবনযাত্রাকে ঘিরে রচিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী চরিত্রগুলো স্থান পেয়েছে।
১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া মহকুমার গোকর্ণঘাট গ্রামে বাংলা সাহিত্যের এই অবিস্মরণীয় প্রতিভার জন্ম। দরিদ্র ধীবর পরিবারে অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্ম। পিতার নাম অধরচন্দ্র।শৈশবেই পিতৃ-মাতৃহীন হন তিনি। গ্রামের মালোদের চাঁদার টাকায় তার লেখাপড়ার খরচ চলতো।
১৯৩৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার অন্নদা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে কিছুদিন আই,এ পড়েন। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক সঙ্কটের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ১৯৩৪ সালে কলেজের পড়া ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে কলকাতা চলে যান। সেখানে মাসিক ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর ১৯৩৬ সালে ক্যাপ্টেন নরেন দত্ত পরিচালিত ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় যোগ দেন তিনি। পত্রিকাটির সম্পাদক কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহকারী হিসেবে সহ-সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। নবশক্তি’র প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র “মাসিক মোহাম্মদী” পত্রিকার সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগ দেন। তিন বছর এ পদে দায়িত্ব পালন করেন অদ্বৈত। এ সময়ে একই সঙ্গে দৈনিক আজাদেও কাজ করেন তিনি।
এছাড়া নবযুগ, কৃষক ও যুগান্তর পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আয় বৃদ্ধির জন্য বিশ্বভারতীর প্রকাশনা শাখায় খণ্ডকালীন চাকরিও করেন।
‘তিতাস একটি নদীর নাম প্রথমে মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে ছাপা হওয়ার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় হারিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব ও অতি আগ্রহী পাঠকদের অণুরোধে তিনি পুণরায় কাহিনীটি লেখেন। হাসপাতালে যাওয়ার আগে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধুদের দিয়ে যান। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
এই উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে উপমহাদেশের বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৩ সালে তিতাস একটি নদীর নাম সিনেমা তৈরী করেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে ঋত্বিক কুমার ঘটক বলেন, “তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্ত লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার যৌবনবতী। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।”
অকৃতদার নিঃসঙ্গ অদ্বৈত বহু কৃচ্ছ্রসাধন ও উদয়াস্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যতটুকু আয়-উপার্জন করতেন তার অধিকাংশই ব্যয় করতেন দুঃস্থ পরিচিতজনদের মধ্যে। তার গ্রন্থপ্রীতি ছিল অসাধারণ। প্রচন্ড অর্থকষ্টের মধ্যেও যথাসম্ভব বই কিনেছেন তিনি। আর্থিক সঙ্গতি কম থাকা স্বত্ত্বেও কলকাতার মালোপাড়ার শিশু-কিশোরদের ঘরোয়া বিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করতেন। ১৯৫১ সালের এই দিনে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার নারকেলডাঙ্গার ষষ্ঠীপাড়ার নিজ বাড়িতে অদ্বৈত মল্লবর্মণ মারা যান।
২০১২ সালের পহেলা জানুয়ারি ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাটে অদ্বৈত মল্লবর্মণের পৈতৃক বাড়িতে তার এই আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে এবং জেলা পরিষদের অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হয়।

0Shares

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ওয়াহিদুজ্জামান
ফোনঃ +৮৮-০১৭৪২৩৪১৫২৩
ইমেইলঃ wzaman288@gmail.com

স্মরনিকা
২৪৭, টুটপাড়া মেইন রোড,
খুলনা-৯১০০, বাংলাদেশ ।
মোবাইলঃ+ ৮৮-০১৯২২৫৫৭৮৯৬
ইমেইলঃ dkhulnanews@gmail.com

কপিরাইট © ২০১৭ |
সর্বস্বত্ব ® স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ডিজিটালখুলনা.কম |
উন্নয়নে Real IT Solution